Cinque Terre
117 N

স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা ও সুপারিশ

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসা সেবা, যন্ত্রপাতি ব্যবহার, ওষুধ সরবরাহ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য খাতে এমন কোন জায়গা নেই যে সেখানে দুর্নীতি হয় না। বছরের পর বছর এই সকল দুর্নীতিগুলো অনবরত ঘটে যাচ্ছে অথচ সরকারের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। অবিলম্বে বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করে স্বাস্থ্য খাতের সকল দুর্নীতি ও অনিয়ম চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন এখন সময়ের দাবী। স্বাস্থ্য খাতকে ব্যবহার করে আর যেন কোন সাহেদ-সাবরিনা তৈরী না হয়।

 

সমগ্র স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আজ ভেঙে পড়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের দুর্নীতির সীমা-পরিসীমা নেই। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা থেকে শুরু করে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা-সর্বত্রই দুর্নীতিবাজদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগসাজসে স্বাস্থ্য প্রশাসনের কর্মকর্তারা রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কোটি কোটি টাকার যন্ত্র বা চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ব্যবস্থা করেন। বিনিময়ে ঠিকাদার থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা কমিশন পান। একদিকে সরকারি হাসপাতালগুলোয় বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষা-নীরিক্ষা করার ব্যবস্থার ঘাটতি অন্যদিকে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে চলে রমরমা ব্যবসা।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকেই শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়া দরকার। সরিষার মধ্যের ভূত আগে দুর করতে হবে, অন্যথায় এ খাতের অব্যবস্থাপনা কোন দিন দুর হবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লোকজন প্রতি বছর মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁশ করে একদিকে যেমন মেডিকেল শিক্ষাকে ধ্বংশ করছে, অন্য দিকে তেমনি প্রশ্ন জালিয়াতির মাধ্যমে দেশে দুর্নীতিবাজ চিকিৎসক তৈরী হচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অদক্ষতা ও আমলাতান্ত্রিক দৌরাত্যের কারণে স্বাস্থ্যখাতের এই বেহাল অবস্থা।

 

করোনা স্বাস্থ্য খাতের করুণ অবস্থা প্রকাশ করে দিয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যে কত দুর্নীতিগ্রস্থ সেটা জনগণ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। মানুষ শুধু আশার বাণী শুনতে চায় না, তারা দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চায়। দেশের অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের কোন অনুমোদন নেই বা সেখানে সরকারের কোন মনিটরিং নেই। অবিলেম্বে একটি যুগোপযোগী স্বাস্থ্যনীতি ও আইন প্রণয়ন করা দরকার।

 

খোদ রাজধানীর কোন সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসার পরিবেশ নেই। বেসরকারী হাসপাতালে যে সব চিকিৎসক বসেন সরকারী হাসপাতালও তারা চালান। কিন্তু সেবার মান দুই রকম হয়ে যায়। বেসরকারী হাসপাতালে বা বিদেশে যারা যেতে পারছেন না, তারা সুচিকিৎসা পাচ্ছেন না। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারের হাসপাতাল বা ক্লিনিক থাকলেও সেসব জায়গায় সর্দি-কাশি ছাড়া কোন প্রকার চিকিৎসা নেই। সেজন্য চিকিৎসার জন্য সবাই রাজধানীতে দৌড়ায়। সরকারী হাসপাতালের ব্যর্থতার কারণে বেসরকারী চিকিৎসা ব্যবসা রমরমা আকার ধারণ করেছে এবং অধিকাংশ জায়গায় অহরহ অপচিকিৎসা বা প্রতারণার ঘটনা ঘটছে।

 

কোন সরকারই প্রত্যন্ত এলাকার চিকিৎসার মানোন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেয় না। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী বা মান সম্মত পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা না থাকায় চিকিৎসকরা জেলা-উপজেলা পর্যায়ে থাকতে চান না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকরা যাতে পরিবার নিয়ে থাকার আগ্রহ দেখায় সেজন্য সে সব পর্যায়ে শিক্ষা ও নিরাপত্তাসহ জীবন যাপনের অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পুরণের পরিবেশ তৈরী করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির চিত্র নতুন নয়, ৩৭ হাজার টাকায় পর্দা কেনা বা ৫ হাজার টাকায় বালিশ কেনার ঘটনা অনেক পুরনো। কোটি কোটি টাকায় কেনা চিকিৎসা সরঞ্জামাদি বছরের পর বছর বাক্সবন্দি হয়ে নষ্ট হয়ে যায়, আবার বেসরকারি হাসপাতালেও এসব দামী দামী সরকারি সরঞ্জামাদি পাওয়া যায়। শুধু সরঞ্জামাদি নয়, সরকারি ওষুধও দেদারসে বাজারে পাওয়া যায়। এসব অপকর্মে যারা জড়িত থাকে তাদের কিছুই হয় না।

 

বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষা মান সম্মত না। এ খাত নানান দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত। মেডিকেল ভর্তিতে প্রতি বছর প্রশ্ন ফাঁশের অভিযোগ ওঠে। চিকিৎসা ব্যবস্থা শুধু চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করে না। তারা ছাড়াও নার্স, টেকনোলজিস্ট ও ব্যবস্থাপনা সহকারী মিলেই চিকিৎসা ব্যবস্থা চলে। সবক্ষেত্রে উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন যা এদেশে হয় না। বেসরকারী হাসপাতাল মালিকদেরকে আরো বেশী মানবিক হতে হবে। তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অতি বেশী বাণিজ্যিক আচরণ করেন এবং চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা তাদের বলয় থেকে বেরিয়ে মানবিক আচরণ করতে পারে না।

 

বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানীগুলো অতিমাত্রায় চিকিৎসকদেরকে প্রভাবিত করে যা সুচিকিৎসা প্রাপ্তির অন্তরায়। ওষুধের মান ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ বা বাজার ব্যবস্থাপনা এবং ডায়াগনস্টিক ব্যবসায় সরকারের ন্যূনতম মনিটরিং নেই যার কারণে আমাদের দেশে চিকিৎসায় নানামূখী স্বেচ্ছাচারিতা ও অসাধুতা চলে। ফলে বেড়ে যায় চিকিৎসা ব্যয় এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর অনীহা যা জনরোষ বা হিংসাত্মক ঘটনার জন্ম দেয়।

 

আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থা নেই স্বয়ং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ সর্বস্তরের সরকারি ও বেসরকারি কর্তা ব্যক্তিদের। সেজন্য তারা কোন কিছু হলেই বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান। রাষ্ট্রীয় খরচে যারা বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান তারা ইচ্ছা করলেই দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারেন। কিন্তু তাদের কাছ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ না আসায় চিকিৎসা খাতে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দৌরাত্ন দিনকে দিন বেড়েই চলেছে, যার ভূক্তভোগী হচ্ছেন দেশের সাধারণ জনগণ। দেশে বড় বড় মেগা প্রকল্প গ্রহণের চেয়ে স্বাস্থ্য খাতের করুণ অবস্থা থেকে উত্তোরণ বেশী জরুরী।

 

আমাদের মূল ধারার চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে সাথে হোমিওপ্যাথি, আয়ূর্বেদ/ইউনানী, আকুপাংচার, ফিজিওথেরাপি ইত্যাদি বিষয়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও মনিটরিং দরকার। প্রতি বছর বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বৃহত্তর বরাদ্দ থাকে, অথচ তলাবিহীন ঝুড়ির মতো সব বরাদ্দ নর্দমায় তলিয়ে যায়। রিজেন্ট ও জেকেজি থেকে করোনার ভূয়া পজিটিভ রিপোর্ট দিয়ে কোন সরকারি চাকরিজীবী বা অন্য কেউ সরকারের কোন আর্থিক সুবিধা গ্রহন করেছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখতে হবে এবং সেটা ইচ্ছাকৃত হলে প্রদত্ত সুবিধা বাতিলসহ তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *