Cinque Terre
FB IMG 1588243944746

রাজনীতি কী

রাজনীতি কী

বেঁচে থাকার জন্যে মানুষ প্রথমে যা চায় সেটা হচ্ছে খাদ্য। জন্মেই মানুষ খাদ্য চায়। খাদ্যের চাহিদা পুরণ হলে সে বস্ত্র চায়। প্রকৃতির বৈরী আবহাওয়া ও লজ্জা নিবারণের জন্যে তার বস্ত্রের প্রয়োজন হয়। তার তৃতীয় চাহিদা বাসস্থান। নিজের অবস্থান ও প্রকৃতির প্রতিকুল পরিবেশে নিজেকে সুরক্ষার জন্যে তার একটি নিরাপদ জায়গা লাগে। এটাই তার বাসস্থান। যদি রাস্তা দিয়ে একজন স্বাস্থ্যবান সুদর্শন ব্যক্তি হেটে যায় তবে ধরে নিতে হবে লোকটা ভাল খেতে পায় এবং সেটা নিয়মিত। একদিন দাওয়াত খেল পেট পুরে, অমনি সে সুন্দর ও স্বাস্থ্যবান হলো, ব্যাপারটা তা নয়। তাকে নিয়মিত ভাল খেতে হবে এবং ভাল কাপড়-চোপড় পরতে হবে। সাথে সাথে ভাল জায়গায় বসবাস করতে হবে। ক্ষুধা, শীত, বর্ষা, ঠান্ডা, রোদ, মশা, মাছি, অধিক পরিশ্রম, রোগ ইত্যাদি জীবনের জন্যে প্রতিকূল। এই প্রাকৃতিক প্রতিকূল উপাদানগুলো থেকে যে যত মুক্ত থাকবে, সে তত সুন্দর ও স্বাস্থ্যবান থাকবে এবং এসব থেকে মুক্ত থাকতে গেলে শিক্ষা ও চিকিৎসাও দরকার হয়। সুতরাং অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা মানুষের মৌলিক চাহিদা যেগুলো ছাড়া বেঁচে থাকা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

মৌলিক চাহিদাগুলো নির্বিঘ্নে মেটানোর জন্যে মানুষের নিরন্তর সংগ্রাম চলছে সৃষ্টির শুরু থেকে। এই সংগ্রামের জন্যে মানুষের যে পথ চলা, সে পথ সব সময় বা সবার জন্যে মসৃন হয় না। খাদ্য মানুষ বসে থেকে পায় না। তাকে খাদ্য সংগ্রহের জন্যে বাসস্থানের বাইরে বের হতে হয়। একজন তাঁতী বাসস্থানে বসে কাপড় তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করে, কিন্তু সুতা বা উপকরণাদি কিনতে এবং কাপড় বিক্রী করে খাবার আনতে তাকে বাইরে যেতে হয়। একজন কৃষক গ্রামে থেকেই জীবন ধারণের উপযোগী কৃষি উৎপাদন করে, তবে তাকেও বাইরে যেতে হয় বেচা-কেনার জন্যে। যারা চাকরি বা ব্যবসা করে তাদেরকে যেতে হয় আরো দুরে, বাসস্থান ও গ্রামের বাইরে তো বটেই, অনেক দুরে, থানা-জেলা ছেড়ে রাজধানীতে অথবা দেশ ছেড়ে বিদেশে।

এই যে জীবিকার জন্যে ঘরের বাইরে যাওয়া, তার জন্যে মানুষের অনেক কিছু দরকার হয়- রাস্তা, বাহন, নিরাপত্তা ইত্যাদি। এগুলোও আবার একেক জনের একেক রকম। প্রকৃতি এগুলো তৈরী করে দেয় না। মানুষকে এগুলো তৈরী করে নিতে হয়। কিন্তু মানুষ এককভাবে পূর্ণাঙ্গ কিছু করতে পারে না। মানুষ যা পারে তা সামান্য, আংশিক। সুতরাং মানুষ পরষ্পরের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা কখনও ব্যক্তির ওপর, আবার কখনও গোষ্ঠি বা রাষ্ট্রের ওপর। রাষ্ট্র মানে সম্মিলিত বৃহৎ জনগোষ্ঠিকে বোঝায়।

অর্থাৎ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পুরণের জন্যে যে সকল উপকরণাদি প্রয়োজন হয় সেগুলো মিটাতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রধান মনে হলেও ব্যক্তির দায়িত্বই মূখ্য। ব্যক্তি তার ওপর অর্পিত দায়িত্বসমুহ সুচারুরূপে পালন না করলে কেউই ভাল থাকে না, রাষ্ট্রও পিছিয়ে পড়ে। ব্যক্তি যদি ন্যায় বিচারবোধ সম্পন্ন হয়, তবে সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা পায় এবং সেখানে রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগের দরকার হয় না। সুতরাং সবার কল্যাণের জন্যে ব্যক্তি গঠন প্রয়োজন যার ভিত্তি রাজনীতি এবং লক্ষ্য মানুষের সার্বিক চাহিদা পুরণ করা।

ঈমামতি, লেখালেখি, গান-বাজনা, ছবি আঁকা, ধর্ম-কর্ম, তাবলিগ, সহীহ হাদীস আন্দোলন, পীরের দরগার খাদেম হওয়া, ভাল আইনজীবী হওয়া, এনজিও বা সামাজিক সংগঠন করা, মিডিয়া টক শো করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা, ঘটকালি করা- এসব কাজে শত্রু জন্মানোর ভয় থাকে না, বরং ভালবাসা পাওয়া যায়, মানুষ দাওয়াত করে খাওয়ায়।

এসব কাজ যারা করে তাদের শত্রু নেই। তারা কারও কাজে বাধা হয়ে দাড়ায় না। সবার সাথে তাল মিলিয়ে, গা বাঁচিয়ে চলে। চলার পথে কোন অন্যায় দেখলে না দেখার ভান করে ভিন্ন পথে গিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে গ্লাস ভরে পানি খায় আর হাহুতাশ করে বলতে থাকে সমাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, দেখার কেউ। মহল্লার মোড়ে বখাটেরা কোন মেয়েকে উত্যক্ত করতে দেখলে তারা উকি মেরে একটু দেখে মেয়েটি কে। যদি তার মেয়ে বা বোন না হয় কবে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। কোথাও মাদক সেবনের আড্ডা বসলে উকি মেরে দেখে তার ছেলে বা ভাই সেখানে আছে কিনা। তারপর চলে যায়। নিজের মেয়ে বা ভাই যদি বখাটে বা দুর্বৃত্তদের দ্বারা আক্রান্ত হয়, তবে লোকলজ্জার ভয়ে এরা গোপন করে ফেলে অথবা কপালের দোষ দিয়ে আল্লাহর দরবারে বিচার দেয়। কিন্তু দুর্বৃত্তদের কোন প্রকারে এরা ক্ষেপাতে চায় না, বরং নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে চায় বিভিন্ন নজরানার বিনিময়ে।

নিরিহ ভদ্র লোকরা এখন রাজনীতিতে আসতে চায় না। তাদের নিষ্ক্রিয়তার ফলে রাজনীতি চলে যাচ্ছে দুর্বৃত্ত, দুর্নীতিবাজ, অসৎ ও বখাটেদের হাতে। এরা কোন নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা করে না। সর্বত্র তাদের নেতৃত্বের কারণে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে বিরাজ করছে সহিংসতা, অনাচার, অবিচার, জুলুম, নির্যাতন, সন্ত্রাস, হত্যা, অপহরণ ইত্যাদি অপরাধ। সব রকম অপরাধের পিছনে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা জড়িত। রাজনীতি এখন আর সেবা নয়, হয়ে গেছে অসৎ উপায়ে আয়ের উৎস। সামাজিকভাবে রাজনীতিকরা এখন আর শ্রদ্ধার পাত্র নয়, হয়ে গেছে ঘৃণ্য বা ভয়ংকর কিছু।

রাজনীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্র চালনার দায়িত্ব গ্রহন। রাষ্ট্র তো বিশাল ক্ষেত্র যা সব কিছুর মোহনা। এমন কোন বিষয় থাকেনা যা রাষ্ট্রকে চিন্তা করতে হয় না। রাষ্ট্রযন্ত্রের চালককে সব বিষয়ে জ্ঞান থাকতে হয়। ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, প্রকৃতি, সকল জীব, জড়, প্রাণী, বস্তু পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয় রাষ্ট্রকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *