Cinque Terre
116799397 3811353618881909 3341377870972903392 O

আমার স্মৃতিতে মমতাজ আহমেদ

দক্ষিণ বাংলার অবিসংবাদিত নেতা, বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সমাজ সেবক মরহুম মমতাজ আহমেদের নাম শুনতাম ছেলে বেলায় বাবা-চাচাদের মুখে। বাবা মমতাজ আহমেদের খুব ভক্ত ছিলেন। হঠাৎগঞ্জ হাই স্কুলে পড়ার সময় তাঁর নাম আরো বেশী শুনতাম এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তাঁর অনন্য অবদানের কারণে। উপরোন্ত আলতাফ হোসেন লাল্টু যখন ৫নং কেড়াগাছী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন, তখন সবাই বলত ’মমতাজ সাহেবের ভাইপো’। কিন্তু সেই বিখ্যাত ব্যক্তিটি তখনও ছিলেন আমার অচেনা।

১৯৯১ সালে আমি কলারোয়া সরকারী কলেজে ভর্তি হই। তখন ফারুক স্যার কলারোয়া কলেজের ছাত্রদের কাছে খুব জনপ্রিয়। সবার নাম জানেন। ছাত্রদের নাম ধরে ডেকে ডেকে কথা বলেন। স্যারের সাবজেক্ট আমার না থাকায় স্যারের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। তবে স্যার মমতাজ সাহেবের ছেলে সেটা আমার জানা ছিল। স্যারকে প্রথম যেদিন দেখলাম মমতাজ সাহেবেকে কল্পনা করলাম। স্যারের পরণে ছিল পায়জামা, পাঞ্জাবী ও শাল। সবই সাদা। আমি কলেজের বারান্দায় স্যারের দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে আছি। স্যার আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই তোর বাড়ি কোথায়?”

আমি বল্লাম, “আইচ পাড়ায়”। তিনি বললেন, “তোর আব্বার নাম কী?” আমি বল্লাম, “নুরুল হাফিজ মাস্টার”। তিনি বললেন, “ও! তুই হাফিজ ভাইয়ের ছেলে? তুই আসিস, আমার সাথে যোগাযোগ রাখিস”। আমি বল্লাম, “স্যার আপনার আব্বা কোথায় থাকেন?” তিনি বললেন, “বোয়ালিয়ায় থাকেন, যাস, দেখা করে আসিস।” আমি হতচকিত হয়ে গেলাম। এত বড় নাম করা ব্যক্তি গ্রামে থাকেন! জানলে তো আমি আগেই দেখতে যেতাম। আমি কখনো ভাবিনি যার নাম এত শুনি তিনি থাকেন আমার মাত্র এক গ্রাম দুরে। তাহলে তো দেখে আসা দরকার লোকটিকে।

কিছুদিন পরে আমি কলেজের হোস্টেলে উঠলাম। সেটা ১৯৯২ সাল। একদিন কী এক কাজে কলারোয়ার হাসপাতাল রোডে গিয়েছি। সাথে আমার বন্ধু লিপু। ও আমাকে একজন লোককে দেখে বললো, উনাকে চেনো? লোকটা সামনে দিয়ে হেটে যাচ্ছে। সারা গায়ে সাদা পোশাক। হাতে একটা লাঠি ও একটা ছাতা। লাঠি ভর দিয়ে হাটছেন না, আবার বর্ষার সময়ও না। মাথায় বাবরি চুল ও ঘাড়ে একটা ব্যাগ। আমি লিপুকে বললাম, “কে উনি?” সে বললো, মমতাজ সাহেব। ততক্ষণে তিনি চলে গেছেন। আকাশ ভেঙে পড়ল তখন মাথায়। আমি লিপুকে বললাম, আগে বলবে না? উনাকে দেখার জন্যে আমার বহুদিনের অপেক্ষা!

গ্রামে আমি একটা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, আইচপাড়া ছাত্র সংসদ। এই সংগঠন থেকে মাঝে মাঝে কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। খ্যাতিমান বিভিন্ন ব্যক্তিদের সেই সব অনুষ্ঠানে দাওয়াত করতাম। মমতাজ সাহেবকে একবার আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। আমরা সাইকেলে কয়েকজন বোয়ালিয়া গেলাম। সেটা ছিল বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান। ডিসেম্বর মাস। হালকা শীতার্ত এক পড়ন্ত বিকাল।

বোয়ালিয়া মেইন রোড থেকে ভেতরের রোডে প্রবেশ করার সাথে সাথে আমার হৃদয়ে এক অভূতপূর্ব অনুভূতি অবতারিত হলো। মমতাজ আহমদের গ্রাম! বোয়ালিয়া। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ী দক্ষিণ বাংলার প্রখ্যাত রাজনীতিক মমতাজ আহমদ। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা মনে পড়ে যায় বোয়ালিয়ার এই ছোট্ট রাস্তার কোনায় এসে। তাদের সংষ্পর্শে যে লোকটি থাকতেন, তাঁকে আজ আমরা দেখতে যাচ্ছি সাইকেলে চেপে ছোট্ট এই কাদা-মাটির ছোট্ট এই পথ বেয়ে। দুপাশে সারি সারি সুপারি গাছ। একপাশে অবারিত মাঠ, অন্যপাশে বিভিন্ন ফলের বাগান। এক কাব্যময় জগৎ।

রবীন্দ্রনাথের শান্তি নিকেতনে যাইনি কখনও। কিন্তু কল্পনার শান্তি নিকেতনের ছায়া ভেসে এলো মমতাজ আহমদের বাড়ীর এই ছোট্ট পথের পাশে। মনে হলো কবিগুরু তাঁর ‘দুই বিঘা জমি’ নামক বিখ্যাত কবিতার দুটি চরণ লিখেছিলেন মমতাজ আহমদের ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় এই পুকুর ধারে এসে: “নমঃ নমঃ নমঃ সুন্দরী মম জননী জন্মভূমি, স্তব্দ অতল দিঘী কালোজল জীবন জুড়ালে তুমি। ” অন্যদিকে নজরুলও হয়ত কোনদিন এসেছিলেন তাঁর কবিতা লেখার প্রয়োজনে: “নমঃ নমঃ বাংলাদেশ মম, চির মনোরম চির মধুর।” এটা মমতাজ আহমদের ভিটা-বাড়ির চিত্র।

তারপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আমরা রাস্তার মাথা থেকে নেমে হেটে আসলাম মমতাজ সাহেবের বৈঠকখানা পর্যন্ত। তিনি যেন আমাদের অপেক্ষায়ই ছিলেন। বালকসুলভ আচরণ, একেবারে বন্ধুর মত। যেন কত দিনের চেনা! কত কথা মনে জমানো। রবীন্দ্রনাথ যেমনটি গেয়েছেন, “মনে রয়ে গেল মনেরই কথা….”। বলার লোক, শোনার লোক বড় অভাব। তাই আমাদের পেয়ে যার পর নেই খুশী। স্মৃতির ভান্ডার খুলে দিলেন আমাদের কাছে। তাঁর সময়ের সমাজ ও রাজনীতির কথা। তিনি আমাদের জানালেন, কলারোয়ার ওপর দিয়ে বঙ্গবন্ধু দুই বার গিয়েছেন। কিন্তু যাত্রা বিরতি করেননি, শুধু একবার গাড়ী থামিয়েছিলেন মাজেদ খাঁ’র বাড়ির পাশে। তখন মাজেদ খাঁ বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেছিলেন।

পরবর্তীতে মমতাজ আহমদের সাথে বহু অনুষ্ঠানে আমার দেখা হয়েছে। প্রত্যেকবার তিনি আমাকে নাম ধরে ডেকেছেন। জানিনা তিনি আমার নাম কিভাবে মনে রাখেন। মানুষকে নাম ধরে ডাকলে যে খুশী হয় তা নাকি তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছে শিখেছিলেন। এটা নেতৃত্বের একটি বিশেষ গুণ।

তিনি শতবর্ষী ছিলেন, তবে তাঁর চোখের জ্যোতি কমেনি একটুও। বছর দুয়েক আগে ঢাকার বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে সাতক্ষীরার সাবেক ডিসি আবদুস সামাদ ফারুক রচিত দুটি কাব্যগ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে মমতাজ সাহেব উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ থেকে কবি আবদুস সামাদ ফারুককে নিয়ে লেখা দুটি কবিতা আবৃত্তি করেন দাড়িয়ে কোন চশমা ছাড়াই দরাজ কণ্ঠে। সেদিন উপস্থিত শ্রোতা-দর্শকরা হতবিহ্বল হয়ে যান তাঁর তারুণ্য ভরা কণ্ঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *